সাইকেল লেনেও পার্কিং-দোকান, চলছে বাস-ট্রাক ঘেঁষে
2026-03-28 - 02:11
‘ঢাকার সড়কে খুব বেশি গতিতে সাইকেল চালানো যায় না। প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল, বাস, রিকশা—সব ধরনের যানবাহনের সঙ্গেই আমাদের চলতে হয়। আবার তাদের গতির সঙ্গে সাইকেলের গতিও মেলে না। ওভারটেক করতে চাইলে ওভারটেক করা যায় না। অনেক সময় উল্টো দিক থেকে গাড়ি চলে আসে। এ অবস্থায় সাইকেল চালানো খুবই কঠিন ও অনিরাপদ। আলাদা লেন না থাকায় সড়কে নিরাপদে সাইকেল চালানোর সুযোগই থাকে না।’ কথাগুলো বলছিলেন মিরপুরের কচুক্ষেতের বাসিন্দা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মাহফুজ হোসাইন। শিপন নামে আরেক সাইক্লিস্ট বলেন, ‘দেশে যেখানে যেখানে বাইসাইকেলের লেন তৈরি করা হয়েছে, সেখানে পার্কিং বা ভ্রাম্যমাণ দোকানগুলোই বসে থাকে। এই লেনে আমরা কখনো চালাতে পারি না। লেন থাকলে অবশ্যই সুবিধা হতো, নিরাপত্তা বাড়তো।’ কিছু সড়কের দুই পাশেই সাইকেলের লেন ছিল। ফুটপাতে চটপটি বা ভ্রাম্যমাণ দোকান হওয়ার কারণে লেনগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। তবে আগারগাঁও অংশে লেন পুরো সক্রিয় রয়েছে।-ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান ঢাকা শহরের সড়কে শুধু এই দুজনই নন, সাইকেল চালাতে গিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন প্রায় সব চালক। পরিবেশবান্ধব এ যানের জনপ্রিয়তা বাড়লেও সড়কে নেই আলাদা লেন। যে গুটিকয়েক সড়কে লেন করা হয়েছিল, সেগুলো দখল হয়ে গেছে। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে করা আলাদা লেন বেশিরভাগ সময় থাকে গাড়ি ও দোকানিদের দখলে। সাইক্লিস্টরা বলছেন, এমন বড় রাস্তায় লেন না করে ছোট ছোট রাস্তাগুলোতে লেন করা বেশি প্রয়োজন ছিল। নতুন সরকারের কাছে সাইক্লিস্টদের দাবি, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে বাইসাইকেলের জন্য যেন আলাদা লেন করা হয়। সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও ধারণা করা হয়, দেশে প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখের মতো বাইসাইকেল চলে। গবেষণা ও শহর পরিকল্পনার কিছু তথ্য অনুসারে, ঢাকা শহরে প্রায় দুই লাখ সাইকেল রয়েছে। মোট যানবাহনের তুলনায় এ সংখ্যা নগণ্য হলেও বর্তমানে ঢাকা শহরে পরিবেশবান্ধব দ্বিচক্রযানের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। এখন বাসা থেকে অফিসে নিয়মিত যাতায়াত করেন হাজারো সাইক্লিস্ট। পার্সেল পরিবহনেও সাইকেল এখন জনপ্রিয়। শহরের রাস্তায় প্রতিনিয়তই চোখে পড়ে বাইসাইকেল। আমরা যারা সাইকেল চালাই, তারা আসলে জীবন হাতে নিয়ে সাইকেল চালাই। সড়কে সাইকেলিস্টদের তেমন মূল্যায়ন করা হয় না। গাড়ি, এমনকি অটোরিকশাও অনেক সময় সাইকেলকে ধাক্কা দিয়ে চলে যায়। দুর্ঘটনা ঘটলেও সাইকেল চালকের প্রতি আচরণ ভালো হয় না।-বাংলাদেশ সাইকেল লেন বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি আমিনুল ইসলাম ঢাকা শহরে প্রায় ৩০ বছর ধরে বাইসাইকেল চালান চাঁদপুরের মোরশেদ। গুলশান-১ এলাকায় কথা হলে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গাড়িচালক মোরশেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘সাইকেল চালানো আমার শখ। এখন পর্যন্ত তিন-চারটি সাইকেল চেঞ্জ করেছি। তবে রাস্তায় সাইকেল চালাতে খুব সমস্যা হয়। সাইকেলের পেছনে এসে অন্য গাড়ি লেগে যায়। আবার গতি কম থাকায় সাইড কেটে দ্রুত চলেও যাওয়া যায় না। তবে সবচেয়ে উপকার কোনো জায়গায় যানজট থাকলে হাতে করে নিয়ে অন্য রাস্তা দিয়ে চলে যাওয়া যায়। এতে রাস্তায় চলাচলে সময় কম লাগে। আর শরীরও ভালো থাকে।’ সাইকেলের জন্য আলাদা লেন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে মন্তব্য করে গণমাধ্যমকর্মী ও সাইক্লিস্ট মোহাম্মদ নূরুল হক জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাইসাইকেল পরিবেশবান্ধব। বাহনটি অযান্ত্রিক, গতিও নিয়ন্ত্রিত। তাই নির্দিষ্ট লেনে কেবল এই বাহনটি চললে কোনো রকমের দুর্ঘটনার আশঙ্কা নেই। কিন্তু দুঃখের বিষয় সড়কে আলাদা লেন না থাকায় যান্ত্রিক বাহনগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়েই বাইসাইকেল চালাতে হয়, যা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।’ তিনি বলেন, ‘স্বতন্ত্র লেন না থাকায় যান্ত্রিক বাহনগুলো প্রায়ই এসে বাইসাইকেলকে ধাক্কা দেয়। একই সঙ্গে যান্ত্রিক বাহনের চালকদের বিদ্রূপ-রোষানলের শিকারও হতে হয় বাইসাইকেলচালককে। এ কারণে নিরাপদ চলাচলের স্বার্থেই সড়কে আলাদা বাইসাইকেল লেন এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।’ আমাদের মিক্সড ট্রাফিকটা এমনিতেই অনেক জটিল। এখানে যান্ত্রিক-অযান্ত্রিক ও ছোটবড় সব ধরনের গাড়ি একই সড়কে চলে। এই জটিল ট্রাফিকের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকে অযান্ত্রিক বাহন, বিশেষ করে দ্বিচক্রের বাইসাইকেল।-বুয়েট অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান আগারগাঁও এলাকায় কথা হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাইকেলচালক মোহাম্মদ মাহফুজ হোসাইন বলেন, ‘আমাদের শহরে সাইকেলের জন্য আলাদা লেন না থাকাটা খুবই সিরিয়াস একটি সমস্যা। সাইকেলের জনপ্রিয়তা বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু সেফটি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। আমার মনে হয় সাইকেলের জন্য আলাদা লেন অত্যন্ত জরুরি। আলাদা লেন থাকলে আমরা নিরাপদে চলতে পারবো। দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমবে ও সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে।’ সাইক্লিস্টদের ফেসবুকভিত্তিক গ্রুপ ‘হেমন্ত রাইডার্স’র প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মোহাম্মদ হেদায়েতুল হাসান ফিলিপ জাগো নিউজকে বলেন, ‘সাইকেলের জন্য লেন না থাকায় আমরা সবচেয়ে বেশি যে সমস্যাটা ফেস করি, সেটা হলো সড়কে বিক্ষিপ্তভাবে সব ধরনের যানবাহন চলাচল। বাস, গাড়ি, অটোরিকশা—সব একসঙ্গে চলে। আমাদের জন্য আলাদা কোনো দিকনির্দেশনা বা নির্দিষ্ট জায়গা নেই। ফলে অনেক সময় ফুটপাতে উঠে হেঁটে যেতে হয়।’ তিনি বলেন, ‘সাইকেলের জন্য একটা নির্দিষ্ট লেন থাকলে আমরা এক সাইড দিয়ে সুশৃঙ্খলভাবে চলতে পারতাম। যেমন মোটরসাইকেলের জন্য জায়গা ফাঁকা থাকলে তারা সহজে পার হয়ে যায়, ঠিক তেমনি সাইকেলের লেন থাকলে চলাচল অনেক স্মুথ হতো। এতে নতুন সাইক্লিস্ট তৈরি হতো, আরও বেশি মানুষ কমিউটিংয়ে সাইকেল ব্যবহার করতে উৎসাহিত হতো।’ হেদায়েতুল হাসান ফিলিপ আরও বলেন, ‘এখন অনেক জায়গায় সাইকেল লেন থাকলেও সেটি ঠিকভাবে পরিকল্পিত নয় বা গাড়ি পার্কিং দিয়ে দখল হয়ে যায়। আবার অনেক সড়ক প্রশস্ত নয়, তাই সব জায়গায় লেন করা সম্ভবও নয়। তবে যেখানে সম্ভব, সেখানে সঠিক পরিকল্পনায় সাইকেল লেন করা দরকার। পাশাপাশি পার্কিং ব্যবস্থাও বিবেচনায় রাখতে হবে।’ জানতে চাইলে বাংলাদেশ সাইকেল লেন বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি আমিনুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাইসাইকেল ও মোটরযান একসঙ্গে চলাচল করা নিরাপদ নয়। আমাদের দেশেও যেখানে সম্ভব সেখানে সাইকেল লেন করার বিষয়ে হাইকোর্টের রায় আছে। কিন্তু বাস্তবে সাইকেল লেন না থাকায় সাইকেল চালানো খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা যারা সাইকেল চালাই, তারা আসলে জীবন হাতে নিয়ে সাইকেল চালাই। সড়কে সাইকেলিস্টদের তেমন মূল্যায়ন করা হয় না। গাড়ি, এমনকি অটোরিকশাও অনেক সময় সাইকেলকে ধাক্কা দিয়ে চলে যায়। দুর্ঘটনা ঘটলেও সাইকেল চালকের প্রতি আচরণ ভালো হয় না।’ আমিনুল ইসলাম আরও বলেন, ‘একজন নতুন সাইকেলচালক রাস্তায় নামলে দিকনির্দেশনা হারিয়ে ফেলে। আলাদা লেন না থাকায় সে নিরাপত্তা পায় না। আবার নির্দিষ্ট পার্কিং ব্যবস্থা না থাকায় অনেকেই সাইকেল চালাতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে যথেষ্ট সহযোগিতাও আমরা পাচ্ছি না।’ নতুন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যানজট দূর করতে হলে সাইকেল লেন একান্ত প্রয়োজন। নিরাপদ সাইকেল লেন থাকলে যে কোনো বয়সের মানুষ সাইকেল চালাতে উৎসাহিত হবে। আমরা পরিবেশবান্ধব সড়ক চাই, আর পরিবেশবান্ধব সড়ক মানেই সাইকেল লেন।’ বিভিন্ন সড়কে দখল হয়ে যাওয়া সাইকেলের লেন উদ্ধারে উদ্যোগ নিতে পারে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। একইসঙ্গে বিভিন্ন সড়কে নতুন করে লেন করা যায় কি না সে বিষয়টি পরবর্তী সমন্বয় সভায় উপস্থাপন করা হতে পারে। জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘কিছু সড়কের দুই পাশেই সাইকেলের লেন ছিল। ফুটপাতে চটপটি বা ভ্রাম্যমাণ দোকান হওয়ার কারণে লেনগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। তবে আগারগাঁও অংশে লেন পুরো সক্রিয় রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের সঙ্গে ট্রাফিক বিভাগ ও বিআরটিএর একটি সমন্বয় সভা রয়েছে। দখল হয়ে যাওয়া বাইসাইকেলের লেন ও নতুন করে লেন করা যায় কি না, সেটি ওই বৈঠকে উপস্থাপন করা হতে পারে। দুই বিভাগ অনুমতি দিলে আমরা এটি নিয়ে কাজ করতে পারবো।’ এ প্রসঙ্গে পরিবহন ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের মিক্সড ট্রাফিকটা এমনিতেই অনেক জটিল। এখানে যান্ত্রিক-অযান্ত্রিক ও ছোটবড় সব ধরনের গাড়ি একই সড়কে চলে। এই জটিল ট্রাফিকের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকে অযান্ত্রিক বাহন, বিশেষ করে দ্বিচক্রের বাইসাইকেল।’ তিনি বলেন, ‘রিকশা যেমন ঝুঁকিতে থাকে, তার চেয়েও বেশি ঝুঁকিতে কিন্তু বাইসাইকেল থাকে। কারণ অন্য যানবাহনের চালক-যাত্রী লোহার খাঁচার মধ্যে থাকে। কিন্তু বাইসাইকেল চালক পুরোপুরি এক্সপোজড, তারা আনকেজড। দুর্ঘটনা হলে সরাসরি ইমপ্যাক্টটা পড়ে চালকের ওপর। এজন্য তাদের নিহত হওয়ার ঝুঁকিও বেশি, পরিসংখ্যানও অ্যালার্মিং।’ বুয়েটের এই অধ্যাপক বলেন, ‘ঢাকা শহরে অতীতে কিছু সড়কে বিক্ষিপ্তভাবে বাইসাইকেলের জন্য আলাদা লেন করা হয়েছিল। কিন্তু সড়কে সুশাসনের অভাবে সেই লেনগুলোতে সরকারি-বেসরকারি গাড়ি পার্কিং করে রাখা হচ্ছে। ফলে বাইসাইকেল লেন পার্কিংয়ে কনভার্ট হয়ে গেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যে সব সড়ক চওড়া ও যেখানে সাইকেলিস্টের সংখ্যা বেশি, সেখানে আলাদা লেন করা জরুরি। একই সঙ্গে বাইসাইকেল চালকদেরও সেফটি গিয়ার ব্যবহার করা উচিত। কারণ তারা আনকেজড—অর্থাৎ খাঁচার মধ্যে নয়, সরাসরি ঝুঁকির মধ্যে থাকে।’ ইএইচটি/এএসএ/এমএফএ