মৃত্যুর ১২ বছর পর স্বাধীনতা পুরস্কার পাচ্ছেন বশির আহমেদ
2026-03-05 - 11:24
জাতীয় পর্যায়ে গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালের স্বাধীনতা পুরস্কার পাচ্ছেন কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী বশির আহমেদ। মৃত্যুর ১২ বছর পর মরণোত্তর তাকে এই সম্মাননা দেয়া হচ্ছে। এই শিল্পীর সঙ্গে এ বছরের স্বাধীনতা পুরস্কারের তালিকায় রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া (মরণোত্তর) এবং জনপ্রিয় উপস্থাপক ও নির্মাতা হানিফ সংকেতসহ মোট ২০ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে পুরস্কারপ্রাপ্তদের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি। বাংলা গানের জগতে অসামান্য অবদানের জন্য স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করা হচ্ছে কিংবদন্তি শিল্পী বশির আহমেদকে। দীর্ঘ সংগীতজীবনে তিনি অসংখ্য জনপ্রিয় গান উপহার দিয়ে শ্রোতাদের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন। বাংলা আধুনিক গানে তার কণ্ঠ ছিল অনন্য, আর সেই অবদানের স্বীকৃতিই মিলছে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননায়। ১৯৩৯ সালের ১৯ নভেম্বর বশির আহমেদের জন্ম কলকাতার খিদিরপুরের সওদাগর পরিবারে। তার বাবার নাম নাসির আহমেদ। উর্দু ছিল তার পরিবারের ভাষা। গানের হাতেখড়ি ওস্তাদ বেলায়েত হোসেন খানের কাছে। গানের জন্য চোদ্দ-পনেরো বছর বয়সে পাড়ি জমান বোম্বে (মুম্বাই)। বোম্বে গিয়ে বশির আহমেদ উঠেছিলেন গীতিকার রাজা মেহেদীর বাসায়। তিনি তাকে ছেলের মতো স্নেহ করতেন। সুরকার নওশাদের সহকারী ছিলেন মোহাম্মদ শফি। তার সঙ্গেও বশির আহমেদের পরিচয় ঘটে। তার মাধ্যমেই বলিউডের সিনেমায় গান গাওয়ার সুযোগ পান তিনি। ১৯৫৪-৫৫ সালের দিকে গীতা দত্ত, আশা ভোঁসলের সঙ্গে ডুয়েট গান গেয়েছিলেন বশির আহমেদ। ঐ সময়ে ওস্তাদ বড় গোলাম আলী খানের কাছ থেকেও তালিম নেয়ার সুযোগ পান তিনি। ১৯৬০ সালে তালাত মাহমুদের সঙ্গে ঢাকা আসেন গান গাওয়ার জন্যে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় তারা একসঙ্গে স্টেজে গান করেন। তারপর ফিরে গেলেও গানের টানেই। কিছুদিন পরপর ঢাকা আসতেন বশির আহমেদ। এই আসা-যাওয়ার মধ্যে এখানে উর্দু চলচ্চিত্র ‘তালাশ’-এ (১৯৬৩) গান গাওয়ার সুযোগ পান। ১৯৬৪ সালে সপরিবারে ঢাকায় চলে আসেন বশির আহমেদ। এদেশে তৎকালীন সময়ে উর্দু চলচ্চিত্র নির্মিত হতো নিয়মিত। আর উর্দু ছবির গানের প্রয়োজনেই কদর বাড়তে শুরু করলো বশির আহমেদের। তার কণ্ঠটিও ছিল উর্দু গানের। ‘তালাশ’ ছবিতে নায়ক রহমানের ঠোঁটের সবগুলো গান গেয়েছিলেন তিনি। একটি গান ছিল-‘কুছ আপনি কাহিয়ে, কুছ মেরি সুনিয়ে’। এরপর জহির রায়হানের উর্দু ছবি ‘সঙ্গম’ (১৯৬৪)-এ গান করেন। বশির আহমেদ উর্দুভাষার গীতিকার, সুরকার এবং শিল্পীও। উর্দু চলচ্চিত্র ‘কারওয়াঁ’ (১৯৬৪)-তে তার নিজের লেখা ও সুরে ‘যব তুম আকেলে হোগে হাম ইয়াদ আয়েঙ্গে’ জনপ্রিয় হয়। অন্য আরও উর্দু চলচ্চিত্রে কাজ করলেও ‘দরশন’ (১৯৬৭) তাকে নিয়ে যায় খ্যাতির শীর্ষে। এই চলচ্চিত্রের গীতিকার, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন তিনি। বাংলা চলচ্চিত্রেও সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন তারপরেই। ‘ময়নামতি’ (১৯৬৯) চলচ্চিত্রে সৈয়দ শামসুল হকের লেখা ‘ডেকো না আমারে তুমি কাছে ডেকো না’, গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা ‘অনেক সাধের ময়না আমার বাঁধন কেটে যায়’। ‘মধুমিলন’ (১৯৭০) চলচ্চিত্রে শহীদুল ইসলামের লেখা ও ফেরদৌসী রহমানের গাওয়া ‘কথা বলো না বলো ওগো বন্ধু/ছায়া হয়ে তবু পাশে রইব’- গানগুলো সুরস্রষ্টা বশির আহমদের উচ্চমানতার নিদর্শন। ষাটের দশকে রেডিওতে খান আতাউর রহমানের লেখা ও সুরে ‘যা রে যাবি যদি যা’ এবং ‘আমাকে পোড়াতে যদি এত লাগে ভালো’ -গান দুটি বশির আহমেদকে বাংলা গানে প্রতিষ্ঠা এনে দেয়। তার আগেই আমাদের বাংলা গানে লায়লা আরজুমান্দ বানু, আনোয়ার উদ্দীন খান, ফেরদৌসী রহমান, মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী, মোহাম্মদ আবদুল জব্বার, ফরিদা ইয়াসমীন প্রমুখ ছিলেন প্রতিষ্ঠিত। তাদের পরে মাহমুদুন্নবী, সৈয়দ আবদুল হাদী, খুরশীদ আলম প্রমুখের পাশাপাশি সঙ্গীতের উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক হিসেবে আবির্ভূত হন বশির আহমদ। বশির আহমেদের কণ্ঠে একটা অন্যরকম মাধুর্য ছিল। তিনি তার সুরের মায়াজালে সহজেই শ্রোতাকে আবিষ্ট করতে পারতেন। বশির আহমদের সুরে, গায়কীতে এমন একটা নিজস্বতা আছে, যা তাকে এক নিমিষেই চিনিয়ে দেয়। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত গাওয়ার মতো দক্ষ কণ্ঠ ছিল বশির আহমদের। রাগভিত্তিক গানগুলো কত সহজে ধারণ করত তার কণ্ঠ। বশির আহমেদের সুরে গান করেছেন ফেরদৌসী রহমান, মোহাম্মদ আবদুল জব্বার, রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমীন থেকে শুরু করে তরুণতর অনেক শিল্পী। একইভাবে আবদুল আহাদ, খান আতাউর রহমান, খন্দকার নুরুল আলম, সুবল দাস, রবীন ঘোষ, সত্য সাহা, আজাদ রহমান থেকে শুরু করে ইমন সাহার মতো তরুণ সুরকারের গানও করেছেন বশির আহমেদ। বশির আহমদের স্ত্রী মিনা বশির একজন কণ্ঠশিল্পী। তাদের এক মেয়ে এক ছেলে- হোমায়রা বশির ও রাজা বশির। তারাও গানের মানুষ। বাবার কাছেই তাদের হাতেখড়ি ও গান শেখা। অর্থাৎ বশির আহমদের পরিবার শিল্পী পরিবার। মিনা বশির নেপালি। তার আরও একটি পরিচয় আছে। তিনি কলকাতার বাংলা সিনেমা ‘পৃথিবী আমারে চায়’-এর নায়িকা মালা সিনহার চাচাতো বোন। ১৯৬৮ সালে বিয়ের আগে তার নাম ছিল লিলি সিনহা। তিনি ছিলেন রবীন্দ্র ভারতীর ছাত্রী। কলকাতায় এক অনুষ্ঠানে বশির আহমদের গান শুনে মুগ্ধ হন। গানের পরে তাদের দেখা এবং পরিচয়। হোমায়রা ও রাজাকে তাদের বাবার সঙ্গে উর্দু এবং মায়ের সঙ্গে নেপালি ভাষায় কথা বলতে শুনেছি। আর বাংলা তো ছিলোই। মাতৃভাষা উর্দু হলেও বাংলাতেও গান লিখেছেন ‘বি এ দ্বীপ’ নামে। বশির আহমদের জনপ্রিয় গানের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- ‘অনেক সাধের ময়না আমার’, ‘আমাকে পোড়াতে যদি এত লাগে ভালো’, ‘আমি সাত সাগর পাড়ি দিয়ে’, ‘যারে যাবি যদি যা/ পিঞ্জর খুলে দিয়েছি’, ‘ডেকো না আমাকে তুমি/ কাছে ডেকো না’। ‘কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি’ সিনেমায় গানের জন্য ২০০৩ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন বশির আহমেদ। সঙ্গীতে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি একুশে পদকেও ভূষিত হন। এছাড়াও পেয়েছেন দেশি-বিদেশি অসংখ্য পুরস্কার সম্মাননা। কিংবদন্তি এই সংগীতশিল্পী ২০১৪ সালের ১৯ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন। এলআইএ