আমদানিতে লোকসান, খুচরা বিক্রিতে ‘অতি লাভ’
2026-03-15 - 09:04
প্রতি কেজি ফলে ৬০-৭০ টাকার বেশি লাভ খুচরা বিক্রেতাদের কম লাভে বেশি ফল বিক্রির অনুরোধ আমদানিকারক ও পাইকারি বিক্রেতাদের প্রতি বছর রমজান মাসে ফলের চাহিদার পাশাপাশি দাম বাড়ে। এবারও বাড়তি আমদানি করা সব ধরনের ফলের দাম। আমদানি বেশি হওয়ায় পাইকারিতে দাম নেই। তবে খুচরা বিক্রেতারা ঠিকই অতি লাভ করছেন। ফলে বিক্রি কমে, দাম না পেয়ে লোকসানে আমদানিকারকরা। চট্টগ্রামের বিআরটিসি ফলমন্ডির আড়তে আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে মাল্টার প্রায় পুরোটাই মিশর থেকে, কমলা আসছে ভারত থেকে। ১০০ পিস হিসাবে প্রতি ১৫ কেজি মাল্টা পাইকারিতে বিক্রি হচ্ছে ৩৩শ থেকে ৩৫শ টাকায়। ৮০-৮৮-৭২ পিস হিসাবে ১৫ কেজি মাল্টা বিক্রি হচ্ছে ৩৬শ থেকে ৩৮শ টাকায়। গত বছরের রমজানেও মাল্টার বাজারমূল্য একই ছিল। কমলা আসছে ভারত ও চায়না থেকে। আড়তে ২৭ কেজি কার্টনের ছোট সাইজের কমলা বিক্রি হচ্ছে ৫২শ থেকে ৫৩শ টাকায়। পাশাপাশি চায়না থেকে আমদানি হওয়া মেন্ডারিন (ছোট কমলা) সাড়ে ৮ কেজির কার্টন বিক্রি হচ্ছে ১৯শ টাকায়। বাজারে বেশ কয়েক জাত ও মানের আপেল পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে চায়না থেকে আসা হানি ফুজি, ক্রাউন আপেল ২০ কেজির কার্টনে বিক্রি হচ্ছে ৩৮শ থেকে ৪১শ টাকায়। গত বছর এসব আপেলের দাম ৪৬শ থেকে ৪৭শ টাকা ছিল বলে জানান ব্যবসায়ীরা। একইভাবে চায়না ভিআইপি আপেল ২০ কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫৭শ থেকে ৬ হাজার টাকায়। অন্যদিকে মালদোভা, পোল্যান্ড এবং সাউথ আফ্রিকা থেকে আসা ১৮ কেজির কার্টন আপেল মান ও সাইজভেদে বিক্রি হচ্ছে ৫৫শ থেকে ৬ হাজার টাকায়। বর্তমানে বাজারে পাওয়া আঙুরের প্রায় পুরোটাই আসছে ভারত থেকে। এর মধ্যে সাদা আঙুর ১০ কেজির কার্টন ২৯শ থেকে ৩২শ টাকা, কালো আঙুর ১০ কেজির কার্টন ৪২শ থেকে ৪৪শ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সাদা বড় আঙুর ২০ কেজির কার্টন বিক্রি হচ্ছে ৬২শ টাকায়। চায়না নাশপাতি ৯ কেজির কার্টন বিক্রি হচ্ছে ২৭শ টাকায়। অনেক বিক্রেতা অতিরিক্ত লাভ করেন। এতে অনেকে খেতে চাইলেও ফল খেতে পারেন না। খুচরা বিক্রেতাদের প্রতি আমাদের অনুরোধ থাকবে, আপনারা সীমিত লাভ করুন, ভোক্তাদের ফল খেতে উৎসাহিত করুন, বেশি ফল বিক্রি করুন।-চট্টগ্রাম ফল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. তৌহিদুল আলম জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, চলতি (২০২৫-২০২৬) অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ১১ মার্চ পর্যন্ত ১ লাখ ৩৬ হাজার ৪৪৫ টন আপেল, ১ লাখ ৮ হাজার ৬১৫ টন মাল্টা, ৬৫ হাজার ৭৪৩ টন মেন্ডারিন (পাতাযুক্ত ছোট কমলা), ৬৭ হাজার ৮৩৭ টন আঙুর এবং ৬ হাজার ১০৪ টন নাশপাতি আমদানি হয়েছে। আরও পড়ুন রোজায় কেজিতে বিদেশি ফলের দাম বেড়েছে ২৫০ টাকা পর্যন্ত রোজার আগেই বাড়লো সব ফলের দাম পেয়ারা-বরই-আনারস- ছফেদা কিনতেও হিমশিম খাচ্ছেন ক্রেতারা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে (১ জুলাই থেকে ১১ মার্চ) আমদানি হয়েছিল ১ লাখ ১৪ হাজার ৮৭১ টন আপেল, ১ লাখ ২০ হাজার ৫৩৩ টন মাল্টা ও কমলা, ৩৭ হাজার ৪২৪ টন মেন্ডারিন (পাতাযুক্ত ছোট কমলা), ৫৭ হাজার ২৬৮ টন আঙুর এবং ৪ হাজার ৩৯৯ টন নাশপাতি। হিসাব অনুযায়ী, গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি অর্থবছর ২১ হাজার ৫৭৪ টন আপেল, ২৮ হাজার ৩১৯ টন মেন্ডারিন, ১০ হাজার ৫৬৭ টন আঙুর এবং ১ হাজার ৭০৫ টন নাশপাতি বেশি আমদানি হয়েছে। তবে একই সময়ে মাল্টা আমদানি কমেছে ১১ হাজার ৯১৮ টন। সবশেষ ১১ মার্চ পর্যন্ত গত এক মাসে দেশে ২৩ হাজার ৪৫৪ টন আপেল, ১৯ হাজার ৯২১ টন মাল্টা, ১০ হাজার ৪৪৬ টন মেন্ডারিন, ১৪ হাজার ৭৫১ টন আঙুর এবং ১ হাজার ৮৭৪ টন নাশপাতি আমদানি হয়েছে। চায়না, মিশর, দক্ষিণ আফ্রিকা, মালদোভা, পোল্যান্ড থেকে কাঁচা ফল আমদানি হচ্ছে। দেশের স্থলবন্দরগুলো দিয়ে প্রায় সব ধরনের ফল আসছে ভারত থেকেও। বিশেষ করে গত একমাসে ভারতের বেনাপোল ও ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে বেশিরভাগ কমলা ও আঙুর এসেছে দেশে। পাইকারি-খুচরার দামে ব্যাপক ফারাক পাইকারি বাজারের চেয়ে খুচরা বাজারে ফলের মূল্যে বিস্তর ফারাক। সরেজমিনে চট্টগ্রাম নগরীর বহদ্দারহাট, চকবাজার, কাজির দেউড়ি, রিয়াজ উদ্দিন বাজার, নিউমার্কেট, আন্দরকিল্লা এলাকায় খুচরা দোকানগুলোতে দেখা যায়, আপেল, মাল্টা, আঙুর, মেন্ডারিন পাওয়া যাচ্ছে। অভিজাত দোকান থেকে ফুটপাতেও মিলছে এসব বিদেশি ফল। আমদানিকারকদের তথ্যে, যে আপেল প্রতি কেজি ২০০-২১০ টাকায় কেনা হয়, খুচরায় একই আপেল বিক্রি হচ্ছে ২৮০-৩০০ টাকায়। যেটি পাইকারিতে কেজিতে ২৩০-২৪০ টাকায় কিনছে, ওই আপেল খুচরায় বিক্রি হচ্ছে ৩২০-৩৫০ টাকায়। পাইকারিতে যে মাল্টা কেজি ২৫০-২৬০ টাকা কেনা পড়ছে, একই মাল্টা খুচরা দোকানে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিদেশি ফলকে বড় লোকের খাবার হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়। চাইলেও কেনার সামর্থ্য না থাকায় কম আয়ের অনেক মানুষ ফল খেতে পারেন না। এক শ্রেণির অতিমুনাফালোভীর কারণে সব সময় ফলের দাম বাড়তি রাখা হয়।-ক্যাব চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন চট্টগ্রাম ফল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. তৌহিদুল আলম জাগো নিউজকে বলেন, ‘রমজানে পর্যাপ্ত পরিমাণে ফল আমদানি হয়েছে। চাহিদার তুলনায় আমদানি বেশি হওয়া, সরকারি শুল্ক বেশি থাকা এবং ডলারের দাম বেশি হওয়ার কারণে আমদানিকারকদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। দু-একটি আইটেম ছাড়া প্রতি আইটেমে এখন লোকসান হচ্ছে আমদানিকারকদের।’ প্রতি কনটেইনার ফলে ৫ থেকে ১২ লাখ টাকা লোকসান হচ্ছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘দেশে কী পরিমাণ ফল আমদানি হচ্ছে, সেটা কেউ জানে না। কে, কখন, কোথা থেকে কোন ফল আমদানি করছেন, সেটা একজনের তথ্য আরেকজন স্বাভাবিকভাবে জানেন না। এ কারণে বাজারে চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি ফল চলে আসছে। পাইকারিতে দামও কমে গেছে। ফলে আমদানিকারকদের লোকসান গুনতে হচ্ছে।’ খুচরা দোকানিদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘১৫ কেজির মাল্টা যখন ৩৮শ টাকা কেনেন, তাতে খুচরায় প্রতি কেজি ২৯০-৩০০ টাকায় বিক্রি করলে হয়। কিন্তু অনেক বিক্রেতা অতিরিক্ত লাভ করেন। এতে অনেকে খেতে চাইলেও ফল খেতে পারেন না। খুচরা বিক্রেতাদের প্রতি আমাদের অনুরোধ থাকবে, আপনারা সীমিত লাভ করুন, ভোক্তাদের ফল খেতে উৎসাহিত করুন, বেশি ফল বিক্রি করুন।’ তিনি বলেন, ‘আমরা আমদানিকারক ও আড়ত হিসেবে কার্টন কার্টন বিক্রি করি। আমাদেরও খুচরা কিনে খেতে হয়। আমরা নিজেরাও কিনতে গেলে দেখি খুচরা বিক্রেতারা ৬০-৭০ টাকা লাভ ধরে বসে থাকে। এটি কাম্য নয়।’ এ বিষয়ে ভোক্তাদের সংগঠন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিদেশি ফলকে বড় লোকের খাবার হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়। চাইলেও কেনার সামর্থ্য না থাকায় কম আয়ের অনেক মানুষ ফল খেতে পারেন না। এক শ্রেণির অতিমুনাফালোভীর কারণে সব সময় ফলের দাম বাড়তি রাখা হয়।’ তিনি বলেন, ‘অথচ সীমিত লাভের মানসিকতা থাকলেও অনেক কম আয়ের মানুষ ফল খেতে পারতেন। এখন প্রশাসনের উচিত খুচরা দোকানগুলো মনিটরিং করা, অতি মুনাফাখোর ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।’ এমডিআইএইচ/এএসএ/এমএফএ