TheBangladeshTime

ওয়ার্ড বয়ও ‘চিকিৎসক’, রোগীর অসহায়ত্ব ঘিরে কর্মচারীদের রমরমা ব্যবসা

2026-03-09 - 03:04

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে দালালের দৌরাত্ম্য নিত্যদিনের। এ নিয়ে বেশ কয়েকবার সংবাদ প্রচার হয়েছে জাগো নিউজে। দফায় দফায় সেনাবাহিনী, র‌্যাব, পুলিশের সহায়তা চেয়েও হয়নি সমাধান। দমানো যায়নি আশপাশের বেসরকারি ক্লিনিকের দালালদের। হৃদরোগ হাসপাতাল থেকে টিকিট কাটার পরও রোগীদের ভাগিয়ে নেওয়ার কাজ তারা করে চলছেন প্রকাশ্যেই। বহিরাগত দালালদের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার মধ্যেই পাওয়া গেছে অভ্যন্তরীণ দালাল চক্রের সন্ধান। হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে কর্মচারীদের একটি সিন্ডিকেট রোগী ভাগানো, ওয়ার্ড বয় হয়েও চিকিৎসক সেজে চিকিৎসা দেওয়া, অতিরিক্ত ওষুধ ক্রয় করিয়ে এনে সেগুলো ফের বিক্রি করা, বেড দিতে টাকা নেওয়া, জোর করে বকশিশ আদায়সহ নানান অনিয়মে জড়িত। এসবের সুনির্দিষ্ট তথ্য, ছবি এবং ভিডিও রয়েছে জাগো নিউজের কাছে। হার্টের রিং পরানো রোগীদের শিট খোলার জন্য ৫০০ টাকা চাইছেন ওয়ার্ড বয় আলাউদ্দিন, ডানের ছবিতে রিং পরানো রোগীদের শিট খুলছেন ওয়ার্ড বয় মশিউর রহমান লাবলু এবং আলাউদ্দিন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এসব অনিয়ম হয়ে আসছে হরহামেশাই। লেখালেখি হলে সাপলুডু খেলার মতো অভিযুক্তদের এক ওয়ার্ড থেকে আরেক ওয়ার্ডে স্থানান্তর করেই দায় সারানো হয়। কার্যত ভেতরে-বাইরে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্যে অসহায় চিকিৎসক এবং তুলনামূলক সৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। সম্প্রতি একজন রোগীর সূত্র ধরে পুরো হাসপাতালের অনিয়মের চিত্র উঠে আসে জাগো নিউজের প্রতিবেদকের কাছে। এসব অনিয়ম হয়ে আসছে হরহামেশাই। লেখালেখি হলে সাপলুডু খেলার মতো অভিযুক্তদের এক ওয়ার্ড থেকে আরেক ওয়ার্ডে স্থানান্তর করেই দায় সারানো হয়। কার্যত ভেতরে-বাইরে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্যে অসহায় চিকিৎসক এবং তুলনামূলক সৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ঘটনাটি চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারির। সকাল সাড়ে ৭টা। মানিকগঞ্জ সদর হাসাপাতাল থেকে বাবা জিন্নাত আলীকে নিয়ে হৃদরোগ হাসপাতালে আসেন ছেলে আবু হুরায়রা। জরুরি বিভাগ থেকে ভর্তি দিয়ে পাঠায় সিসিইউতে। কিন্তু বাধ সাধলেন একজন স্টাফ। জরুরি পরীক্ষার কথা বলে আটকান তিনি। পরীক্ষা করে রোগীর অবস্থা খারাপ দেখিয়ে দ্রুত আইসিইউতে নিতে বলেন। স্বজনরাও চিকিৎসার প্রয়োজনে রাজি হন। স্টাফ নিজেই গাড়ি ঠিক করে পাঠিয়ে দেন পাশের এক বেসরকারি ক্লিনিকে। সেখানে অর্থকড়ি হাতিয়ে নিলেও কার্যত কোনো চিকিৎসা-ই হয়নি। বরং রোগীর অবস্থা আরও অবনতি হয়েছে। তাদের সঙ্গে হওয়া প্রতারণা বুঝতে পেরে প্রতিকার চাইতে গিয়ে মারধরের শিকার হয়েছেন স্বজনরা। এরপর অনেকটা লড়াই করে রোগী হৃদরোগ হাসপাতালে আনলে সেখানেই মারা যান। রোগী ভাগিয়ে দেওয়া ওই স্টাফের খোঁজ এবং বিচার চাইতে গিয়ে হৃদরোগ হাসপাতালেও দফায় দফায় মারধরের শিকার হন পিতার হারানোর শোকে ন্যুব্জ আবু হুরায়রা। ফার্মেসি থেকে ওষুধ বিক্রির টাকা নিচ্ছেন ওয়ার্ড বয় গিয়াস উদ্দিন এ ঘটনার সত্যতা যাচাই এবং নেপথ্যের চক্রের খোঁজে নামে জাগো নিউজ। তিনদিনে হাসপাতালটির ডজনখানেক চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সঙ্গে আলাপ করে নিয়মিত এমন ঘটনার তথ্য পাওয়া যায়। এখানে জরুরি বিভাগ, ক্যাথল্যাব, সিসিইউ-১, সিসিইউ-২ এ অসাধু পৃথক সিন্ডিকেটের সন্ধান মিলেছে। এরা রোগী ভাগানো, জিম্মি করে টাকা আদায় এবং ডাক্তার সেজে ওষুধ লিখে এনে পরে বিক্রি করে দেয়। এসব ঘটনা ভিডিও এবং স্থির চিত্রসহ সংগ্রহ করেছে জাগো নিউজ। জরুরি বিভাগে থেকে সর্বত্র অপরাধী সিন্ডিকেট অনুসন্ধানে জানা যায়, জরুরি বিভাগ থেকে শুরু হয় এই চক্রের কাজ। ওয়ার্ড বয় শহীদুল ইসলাম, রাশেদুল আলম, আশিকুর রহমান, স্ট্রেচার বেয়ারার আলী হোসেন এবং ডোম মো. লিটনের একটি চক্র কাজ করে এখানে। এ চক্রের অনিয়মের শুরু হয় ট্রলি দিয়ে। জরুরি বিভাগে কোনো রোগী এসে টাকা ছাড়া ট্রলি-হুইল চেয়ার পান না। ট্রলি নিয়ে লুকিয়ে রাখা হয় মর্গে। টাকা দিলে এনে দেওয়া হয়। কোনো রোগীর ভর্তি প্রয়োজন হলেও ৫০০-১০০০ টাকা না দিলে ভর্তি হতে পারেন না। বেশি খারাপ রোগী হলে বা সহজ সরল মানুষ হলে ‘রোগীর অবস্থা খারাপ, আইসিইউ লাগবে’- এমন ভয়-ভীতি দেখিয়ে পাঠিয়ে দেয় বেসরকারি ক্লিনিকে। সেখান থেকে পায় মোটা অংকের কমিশন। আরও পড়ুন হৃদরোগ হাসপাতালে দানের মেশিনে ‘মধু’ অনুদানের ‘অবৈধ’ ৮ মেশিন এখন ‘গলার কাঁটা’ অসংক্রামক ব্যাধিতে নিঃস্ব হচ্ছে মানুষ জরুরি বিভাগ থেকে রোগী যায় সিসিইউ-১ বা সিসিইউ-২ এ। ওখানে এমএলএসএস আব্দুল জব্বার, ওয়ার্ড বয় আব্দুল গফুর এবং আশরাফুল হকের সিন্ডিকেট রয়েছে। এর মূল হোতা জব্বার ও আশরাফ (আশরাফুল হক)। সেখান থেকে শুরু হয় ভিন্ন তৎপরতা। একজন রোগীকে বেড দিতে তারা নেয় অন্তত দুই থেকে তিন হাজার টাকা। এখানে টাকা ছাড়া মেলে না বেড। তারা নিজেরাই ডাক্তার সেজে দেন চিকিৎসা। ওষুধপত্র বেশি কিনে সেগুলো পাচার করেন। এমআই নিয়ে ভর্তি রোগীদের ভাগিয়ে নেন কেউ কেউ। হৃদরোগ হাসপাতালেরই একজন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপকের নিজস্ব ক্লিনিকে নিয়ে এনজিওগ্রাম/পিএসআই করা হয়। সেখান থেকে পান কমিশন। জাগো নিউজের হাতে প্রমাণ এসেছে, সিসিইউতে আগে থেকেই স্লিপে ‍ওষুধের নাম লিখে রাখা হয় এবং এতে মেডিকেল অফিসারের সিল মেরে রাখা হয়। রোগীর স্বজনরা আসার সঙ্গে সঙ্গে তাদের ধরিয়ে দেয় ইনজেকশন প্যাথেডিন, মরফিন, ডাইলোফ্লো, নর-এডরিন, টেরিমোসিরিঞ্জ, হ্যাপারিন লেখা স্লিপ। এগুলো রোগীরা কিনে আনার সঙ্গে সঙ্গে রোগীদের হাত থেকে নিয়ে নেয় ওয়ার্ড বয়দের ওই সিন্ডিকেট। প্রতিদিন লক্ষাধিক টাকার ওষুধ বিক্রি করে তিন শিফটের ওয়ার্ড বয়দের সিন্ডিকেট। ওষুধ চুরির টাকার ভাগ পান ব্রাদাররাও। এ কারণে এই কাজে সহযোগিতায় থাকেন ব্রাদার শাহিন, সাদী ও জুয়েল। রোগীকে ওষুধ সেবন করাচ্ছেন ওয়ার্ড বয় আশরাফ শুধু তাই নয়, সিসিইউয়ের রোগীদের জন্য সিভিপি সেট কেনানো হয়, কিন্তু তাদের জন্য ব্যবহার করা হয় না। অন্য রোগীর থেকে খুলে রাখা পুরাতনটা পরিয়ে নতুনটা রেখে দেয়। ওয়ার্ড বয় মালেক এগুলো পরে বিক্রি করেন। একটি সিভিপি সেটের দাম ৩ হাজার টাকা। ক্যাথল্যাবের ওয়ার্ড বয় আলাউদ্দিন ও আব্দুর রহমান এবং এইচডিইউ-এর মশিউর রহমান লাভলু পিএসআই রোগীর শিট খুলে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা করে অতিরিক্ত নেন। অথচ এই কাজটি বিনামূল্যে চিকিৎসকের করার কথা। এ নিয়ে কথা বললে রোগীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন ওয়ার্ড বয়। আরেক ক্যাথল্যাবের ওয়ার্ড বয় সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেট রোগীদের এনজিওগ্রামের পর ওটিতেই ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা করে বকশিশের নামে জোরপূর্বক আদায় করেন। না দিলে রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে চলে দুর্ব্যবহার। হৃদরোগ হাসপাতালের কোনো লিফটম্যান লিফটে ডিউটি করেন না। তারা কেউ আউটডোরে, কেউ চিকিৎসকদের রুমে, কেউ জরুরি বিভাগে ডিউটি করেন। কারণ, এসব জায়গায় ডিউটি করে আউটডোর থেকে রোগী বাইরের ক্লিনিকে পাঠিয়ে কমিশন পান। জরুরি ভাস্কুলার ওটিতে রয়েছে ওয়ার্ড বয় গিয়াস উদ্দিন, আলমগীর হোসেন এবং মিরাজ শেখের সিন্ডিকেট। যেসব রোগী রগ ছেঁড়া নিয়ে আসেন, তাদের ১০ থেকে ২০ হাজার টাকার ওষুধ কেনান তারা। আবার এগুলো একই ফার্মেসিতে ফেরত দিয়ে টাকা নিয়ে আসেন। এজন্য ওষুধ কিনতে নিজেরাই রোগীর স্বজনদের অন্তরা ফার্মেসিতে নিয়ে যান। সেখানে তাদের রয়েছে চুক্তি, ওষুধ কেনার পর রিসিভ করে দিনশেষে ফের নিজেরাই ওই ফার্মেসিতে ফেরত দিয়ে টাকা নিয়ে নেন। এ সংক্রান্ত ভিডিও ফুটেজ জাগো নিউজের হাতে রয়েছে। জানা গেছে, একটা ক্যাথেটার দিয়ে তিনজনকে সেবা দেওয়া যায়। এই সিন্ডিকেট প্রতিটি রোগীকে দিয়ে ৫ হাজার টাকা মূল্যের এই সরঞ্জাম কেনালেও প্রতি তিনজনের মধ্যে দুইজনেরটা পরে বিক্রি করে দেন। হৃদরোগ হাসপাতালের কোনো লিফটম্যান লিফটে ডিউটি করেন না। তারা কেউ আউটডোরে, কেউ চিকিৎসকদের রুমে, কেউ জরুরি বিভাগে ডিউটি করেন। কারণ, এসব জায়গায় ডিউটি করে আউটডোর থেকে রোগী বাইরের ক্লিনিকে পাঠিয়ে কমিশন পান। অনুসন্ধানে জাগো নিউজ পেয়েছে, জরুরি বিভাগে থাকেন লিফটম্যান সুমন। তিনি থাকা অবস্থায় কোনো রোগী পেলে তাকে সিসিাইউ-১ অথবা সিসিইউ-২ এ নিয়ে রোগীর লোকজনকে বলেন- ‘এখানে লাইফ সাপোর্ট থেকে শুরু করে সব কিছু ফ্রি করে দেবো, আমাকে ৫ হাজার টাকা দেবেন’। বিপদের সময় রোগীরাও রাজি হয়ে যান। লিফটম্যান সুমনের এমন কাজের প্রমাণ হিসেবে ছবি ও ভিডিও জাগো নিউজের হাতে আছে। নার্সের চেয়ারে বসে রোগীর জন্য ইনজেকশন প্রস্তুত করছেন ওয়ার্ড বয় আব্দুল গফুর শুধু তাই নয়, ফ্রি ওয়ার্ডে আয়া ও বয়দের টাকা না দিলে বেড পাওয়া যায় না। রোগীদের পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য যাতায়াতে গুনতে হয় অতিরিক্ত টাকা। বহিঃবিভাগের গেট, চিকিৎসকের রুমের সামনে এবং তিন নম্বর গেটে দিনভর ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের উৎপাত চরমে। ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে চা, বুট-বাদাম, পেয়ারা-আমড়া নিয়ে হকারদের ছোটাছুটিও আছে চোখে পড়ার মতো। জরুরি এবং বহিঃবিভাগের সামনে বহিরাগত দালাল এবং তার সামনে অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের উৎপাত পুরো হাসপাতালের ভেতরে-বাইরে চরম অব্যবস্থাপনার চিত্র তুলে ধরে কী বলছেন অভিযুক্তরা অভিযুক্ত ক্যাথল্যাবের ওয়ার্ড বয় আরিফুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘পিসিআই রোগীদের শিট খোলার কাজটা ক্রিটিক্যাল। এটা খোলার দায়িত্ব ডাক্তারদের। তবে আমরাও খুলি।’ টাকা নেওয়ার বিষয়ে জানেতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এগুলো আমরা বাদ (ছেড়ে) দিছি।’ ক্যাথল্যাবে এনজিওগ্রাম হওয়ার পরে রোগীদের কাছ থেকে ৫০০-১০০০ টাকা নেওয়ার বিষয়ে অভিযুক্ত ক্যাথলাবের ওয়ার্ড বয় সাইফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, আপনি হয়তো ভুল শুনছেন। আমরা এমন কাজ করি না। নার্সের চেয়ারে বসে রোগীর জন্য ইনজেকশন প্রস্তুত করেছেন ওয়ার্ড বয় জব্বার সিসিইউ-১ এর ওয়ার্ড বয় আব্দুল মালেকও তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, এরকম কিছু আমার জানা নেই। সিসিইউ-১ এর একজন অভিযুক্তকে ফোন দিলে তিনি স্বীকার করেন- ডাক্তার সেজে চিকিৎসা দেওয়া, বেড দিতে গিয়ে টাকা (ঘুস) নেওয়া, ওষুধপত্র বেশি কিনিয়ে বাইরে বিক্রি করা এবং বেসরকারি হাসপাতালে রোগী ভাগানোর কাজ চলে। তিনি বলেন, ‘এগুলোর আমিও প্রতিবাদ করি। ওয়ার্ড মাস্টাররা রোস্টার করে ৩০০-৪০০ করে নেন। এগুলোর প্রতিবাদ করায় আমাকে এক ওয়ার্ড থেকে আরেক ওয়ার্ডে ঘোরান।’ তবে এই অভিযুক্ত তার নাম না প্রকাশ করতে অনুরোধ করেন। আমাদের অজ্ঞাতসারেই কিছু দুষ্টু চক্র অপরাধ-অনিয়মে জড়িয়ে যায়। এ কাজে চিকিৎসক-কর্মকর্তাদেরও বিক্রি করে। টাকা নেওয়ার সময় বলে- অমুক স্যারকে দেওয়া লাগবে। অথচ তারা জানেনও না। এ ক্ষেত্রে রোগী ও তার স্বজনদের সচেতন হতে হবে। কেউ অনিয়ম করলে যেন আমাদের জানায়, আমরা ব্যবস্থা নেবো। - অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী ভাস্কুলার ওটির ওয়ার্ড বয় গিয়াস উদ্দিনও তাদের বিরুদ্ধে তোলা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। ভিডিও ফুটেজসহ আছে দাবি করলে তিনি বলেন, ‘আমার জানা নেই।’ বাকি অভিযুক্তদের সঙ্গে কথা বলতেও বারবার মুঠোফোনে চেষ্টা করা হয়েছে। তারা সাড়া দেননি। সিসিইউ-২ এ ডাক্তার সেজে চিকিৎসা দিচ্ছেন ওয়ার্ড বয় জব্বার ‘আমার সুস্থ বাবাকে মেরে ফেলেছে, বিচার চাই’ বাবাকে নিয়ে এসে হৃদরোগ হাসপাতালের বিরূপ অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে জাগো নিউজকে আবু হুরায়রা বলেন, ‘শ্বাসকষ্ট নিয়ে মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালে নিছিলাম বাবাকে। তারা হৃদরোগ হাসপাতালে পাঠায়। এখানে সকাল সাড়ে ৭টায় জরুরি বিভাগে আনছিলাম। সেখান থেকে সিসিইউতে ভর্তি দিছে। অথচ, জরুরি পরীক্ষা করার কথা বলে আটকে রাখেন শহীদ নামের একজন স্টাফ। আরও একজনসহ পরীক্ষা করেন। আরেকজন ডাক্তারও নিয়ে আসেন। দেখলাম, ডাক্তার সব শুনে চলে গেলেন। পরে দুইজন স্টাফ আমাকে বললো, আমরা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখছি। উনার হার্টের কোনো সমস্যা নেই। মাথায় সমস্যা। উনাকে দ্রুত আইসিইউতে নেওয়া লাগবে। এখানে আইসিইউ নাই। ঢাকায় কোথাও আইসিইউ পাবেন না। হৃদয় জেনারেল হাসপাতালে আইসিইউ আছে। ওখানে দিনে ১৫ হাজার খরচ। দুই দিনে ৩০ হাজার টাকা লাগবে। দিতে পারলে নিয়ে যান। আমি রাজি হওয়ায় উনারাই গাড়ি ঠিক করে নিয়ে গেছেন।’ আরও পড়ুন দালাল-চোরের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ রোগী-চিকিৎসক বাক্সবন্দি মেশিন এখন ‘চায়ের টেবিল’, টেস্ট করাতে হয় বাইরে এখনো রমরমা ‘মেডিকেল টেকনোলজিস্ট’ বদলি বাণিজ্য তিনি বলেন, ‘সকাল ৮টায় ওখানে (হৃদয় হাসপাতাল) নিয়ে গেছি। প্রথমে ভর্তিতে ৬ হাজার নিছে। সাথে সাথে পরীক্ষা দিছে আরও ৬ হাজার টাকার। ওষুধ কিনতে হয়েছে ৫ হাজার টাকার। তারপর আবার আরও ৫ হাজার ৫০০ টাকার ওষুধ কিনতে দিছে। তখন আমার সন্দেহ হইছে। বললাম, এত ওষুধ একদিনে দিবেন? ওখানে আরও একজনের একদিনে দুই লাখ টাকা বিল করছে। এটা নিয়ে ঝামেলা হচ্ছিল। তখন আমি বললাম, আমাকে তো বলছে দৈনিক ১৫ হাজার লাগবে। লাখ টাকা বিল আসলে কোত্থেকে দেবো?’ আবু হুরায়রা আরও বলেন, ‘পরে যে আমাদের পাঠাইছে হৃদরোগ হাসপাতাল থেকে, তার খোঁজ করতে আসি। এসে তারেও পাই না। এসময় অন্যরা বললো- এখানকার রোগী আপনি ওখানে নিছেন কেন? রোগী নিয়ে আসেন। পরে রোগী আনতে গেছি। তারা আরও ২৭ হাজার বিল করছে। আমি এত টাকা কোত্থকে দেবো? বলছে দিনে ১৫ হাজার অথচ দুই ঘণ্টায় এত পরীক্ষা ওষুধ দেওয়ার পরও বিল করছে ২৭ হাজার। আমি বলছি, দিতে পারবো না। তারা আমাকে মারছে। বলেছে, টাকা না দিলে রোগী দেবে না। পরে ১২ হাজার টাকা ব্যবস্থা করে হাতেপায়ে ধরে রোগী নিয়ে আসতে আসতে দুপুর ২টা হয়েছে। যখন রোগী বের করি তখনই দেখি অবস্থা আরও খারাপ হইছে। পরে হৃদরোগে আনার কিছুক্ষণ পরে মারা গেছেন।’ এভাবে পুরাতন সিভিপি সেট নতুনের মতো প্যকেট করে রাখা হয় ‘ওখানকার (হৃদরোগ হাসপাতালের) একজন আমাকে বলছিল, যে এই কাজ করছে, ওরে ধরতে হবে। ওরা এই কাজ করে। বাবাকে দাফন কাফন করে পরদিন ৯টায় আমি হাসপাতালে গিয়ে ওই লোককে খুঁজি, পাই না। বললো, রাতে তার ডিউটি। পরে রাত ৯টায় পাইছি। তার ছবি তুলছি। সে আমাকে দেখেই একবার বাথরুমে যায়। আবার বের হয়ে যায়। পরে কয়েকজন আনসারসহ অনেক লোক এনে আমাকে ঘিরে ধরে, মারে। মোবাইল কেড়ে নেয়। পরে তার হাত থেকে বাঁচতে কান্নাকাটি করে কোনো রকম বের হয়ে রাস্তায় আসি। তা-ও সে আমাকে চিপায় নিয়ে যেতে চায়। তখন আমি ৯৯৯-এ কল দেই। পুলিশ আসে। পুলিশ বলেছে, হাসপাতালে লিখিত অভিযোগ দিতে।’ যোগ করেন এই ভুক্তভোগী। তিনি বলেন, ‘পরদিন প্রথমে গিয়ে হাসপাতালে লিখিত অভিযোগ দেই। ওখান থেকে বের হওয়ার পথে সিঁড়ি থেকে আমাকে নিয়ে গিয়ে এক জায়গায় আধা ঘণ্টা আটকে রেখে সিকিউরিটি গার্ড ও আনসাররা মিলে মারধর করে। তারাই পুলিশ ডাকে, চোর হিসেবে আমাকে ধরিয়ে দেবে। পরে কয়েকজন লোক এসে আমাকে উদ্ধার করে। ওখান থেকে গিয়ে পরে থানায়ও অভিযোগ করেছি।’ আবু হুরায়রা আরও বলেন, ‘আমার বাবা সুস্থ ছিলেন। আমরা বাপ-ছেলে মিলে কিছুদিন আগে এক চিল্লা (তাবলিগে) দিয়ে আসছি। শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে গেলাম, অথচ চিকিৎসা না দিয়ে তাকে মেরে ফেললো। অভিযোগ দিতে গিয়ে আমিও মাইর খাইলাম। আমি এর বিচার চাই।’ লিফটম্যান সুমন রোগীকে ইনজেকশন দিচ্ছেন হাসপাতালে সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষায় সহযোগিতা চান পরিচালক এসব সমস্যা স্বীকার করে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের অজ্ঞাতসারেই কিছু দুষ্টু চক্র অপরাধ-অনিয়মে জড়িয়ে যায়। এ কাজে চিকিৎসক-কর্মকর্তাদেরও বিক্রি করে। টাকা নেওয়ার সময় বলে ‘অমুক স্যারকে দেওয়া লাগবে।’ অথচ তারা জানেনও না। তিনি বলেন, ‘আমাদের সক্ষমতার চেয়ে বহুগুণ বেশি রোগী আসে প্রতিদিন। যে কারণে অনেক কিছু চোখ এড়াতে পারে। এ ক্ষেত্রে রোগী ও তার স্বজনদের সচেতন হতে হবে। কেউ অনিয়ম করলে যেন আমাদের জানায়, আমরা ব্যবস্থা নেবো। সাংবাদিকদেরও সহযোগিতা চাই, তাদের চোখে পড়লেও যেন আমাদের জানান। সবাই মিলে হাসপাতালে একটা সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষা করতে পারবো। এরই মধ্যে আবু হুরায়রার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অভিযুক্ত শহীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এখন যেসব অভিযোগ পেয়েছি আমরা সেগুলো গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করেছি এবং ব্যবস্থা নিয়েছি।’ ‘বেসরকারি হাসপাতালগুলোর বিষয়েও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। না হয় তারা একের পর এক এমন শহীদ (অভিযুক্ত ওয়ার্ড বয়) তৈরি করবে।’ যোগ করেন হৃদরোগ হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী। এসইউজে/কেএসআর

Share this post: