বৃদ্ধাশ্রমে ঈদ কাটে বাবা-মায়ের, কানাডা-যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন সন্তানেরা
2026-03-23 - 12:10
পাশাপাশি দুটি ভবনে সুনসান নীরবতা। বোঝার উপায় নেই, ভবনগুলোতে কোনো বাসিন্দা আছেন। প্রতিটি রুমের দরজা চাপানো। তবে ভেতরে বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। তাদের কেউ শুয়ে আছেন, কেউ বই পড়ছেন। কেউবা ফেলে আসা অতীতের কথা ভেবে স্মৃতিকাতর হচ্ছেন। ঈদুল ফিতরের দিনটি এভাবেই কাটালেন রাজধানীর আগারগাঁওয়ের প্রবীণ নিবাসের বাসিন্দারা। বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরাবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানের (বাইগাম) প্রবীণ নিবাসের বাসিন্দাদের ঈদ কেটে নীরবে-নিভৃতে। না তারা পেয়েছেন স্বজনদের দেখা, না অনুভব করেছেন ঈদের খুশি। ঈদের তৃতীয় দিন সোমবার (২৩ মার্চ) দুপুরে প্রবীণ নিবাসে গিয়ে দেখা যায়, ঈদ উপলক্ষে সেখানকার কর্তৃপক্ষ বিশেষ খাবারের আয়োজন করেছে। দুপুরের খাবারের পর প্রত্যেকে নিজ নিজ রুমে একাকী সময় কাটাচ্ছিলেন সেখানে থাকা ২৮ জন বাসিন্দা। জানা যায়, ঈদের দিন সকালে পরোটা, মুরগির মাংস ও সেমাই খেতে দেওয়া হয় প্রবীণ নিবাসের বাসিন্দাদের। দুপুরে ছিল পোলাও, মুরগির রোস্ট, খাসির মাংস, জর্দা ও কোমল পানীয়। রাতে ভাতের সঙ্গে রুই মাছ, মুড়িঘন্ট ও ডালের ব্যবস্থা করা হয়। ঈদে বৃদ্ধ বাবাদের নতুন লুঙ্গি-পাঞ্জাবি আর বৃদ্ধ মায়েরা দেওয়া হয় নতুন শাড়ি। আগারগাঁওয়ের এই প্রবীণ নিবাসে গত এক দশক ধরে আছেন এক বৃদ্ধ। নিজের পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে প্রবীণ নিবাসের ওই বাসিন্দা জাগো নিউজকে, তার একমাত্র মেয়ে যুক্তরাজ্যে থাকেন। একা একা ঈদ কাটানো তার কাছে নতুন কিছু নয়। অন্য একটি সাধারণ দিনের মতোই ঈদের দিনও নিজের কক্ষে বসে মোবাইল ফোনে গান শুনে সময় কাটান। কথা হলে তিনি বলেন, ‘এখন আর খারাপ লাগে না। আশপাশের কক্ষে যারা থাকে, তাদের সঙ্গে কথা বলি।’ সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে, প্রবীণ নিবাসে যারা আছেন তাদের অধিকাংশই শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা বা গবেষক। আছেন নামকরা কোনো গীতিকারের স্ত্রী কিংবা কলেজের অধ্যাপকও। তাদের অনেকের ছেলে-মেয়ে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডায় থাকেন। সেসব দেশে সন্তানেরা উন্নত ও আয়েশি জীবনযাপন করলেও দেশে পড়ে থাকা বাবা-মায়ের ঈদ কাটে বৃদ্ধাশ্রমে। সেখানকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেক সন্তান বাবা-মায়ের খোঁজখবরও ঠিকমতো নেন না। এমনকি তাদের বৃদ্ধাশ্রমে থাকা নিয়ে গণমাধ্যমে কখনো কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ হলে তা নিয়েও দূরদেশে থাকা সন্তানেরা তাদের সঙ্গে রূঢ় আচরণ করেন। এজন্য নিজেদের ও সন্তানদের পরিচয় দিতে চান না এসব বৃদ্ধ বাবা-মা। প্রবীণ নিবাসে একটি রুমের ভাড়া ৮ হাজার টাকা। দুজন মিলে রুম শেয়ার করে থাকলে খরচ হয় ৩ হাজার ৫০০ টাকা করে। জনপ্রতি মাসিক খাওয়া খরচ ৩ হাজার টাকা। রান্নার জন্য আছেন তিন জন বাবুর্চি। আবার অনেকে নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী বাজার করেন। বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরাবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানের মহাসচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা ইন্তেজার রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ঈদের দিন বৃদ্ধ বাবা-মাকে নতুন শাড়ি ও লুঙ্গি-পাঞ্জাবি দেওয়া হয়েছে। সন্তানেরা সেভাবে খোঁজখবর নেন না। অনেকের সন্তান যুক্তরাষ্ট্র-কানাডায় থাকেন। উন্নত জীবনযাপন করেন। বৃদ্ধাশ্রমে পড়ে থাকা অনেক মা-বাবা সন্তানের কাছে যেতে চান। কিন্তু তারা তাদের মা-বাবাকে নিজেদের কাছে নিতে চান না। আবার সন্তানেরা নিতে চাইলেও অনেক মা-বাব যেতে চান না। ‘এখানে প্রত্যেকের জীবনের গল্প ভিন্ন। তবে সবাই আল্লাহর অশেষ রহমতে ভালো আছেন। সন্তানেরা খোঁজখবর না নিলেও আমরা সবাইকে আগলে রাখার চেষ্টা করি’—যোগ করেন ইন্তেজার রহমান। এমওএস/এমকেআর