শুধু স্বাস্থ্যে নয়, বায়ু দূষণের গুরুতর প্রভাব পড়ছে ভারতের অর্থনীতিতেও
2026-02-17 - 09:06
প্রতি বছর এই সময়টায় দিল্লিতে অল্প কিছুদিনের জন্য এক স্বল্পস্থায়ী কিন্তু মনোমুগ্ধকর ঋতু আসে। বসন্তের ছোঁয়ায় শহরের বাগানগুলো ফুলে ভরে ওঠে, আর সপ্তাহ দু’এক আকাশ থাকে নীল। তখন প্রায় তিন কোটি মানুষের শহরটি বিষাক্ত দূষণ নিয়ে দৈনন্দিন উদ্বেগ ভুলে স্বস্তিতে ভাবে- হয়তো আবারও শ্বাস নেওয়ার মতো হাওয়া ফিরে এসেছে। কিন্তু তা নয়। দিল্লির বায়ুদূষণ সারা বছরের সমস্যা। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সর্বশেষ যে বছরটির তথ্য পাওয়া যায়, সেই ২০২৪ সালে একদিনও ‘ভালো’ মানের বাতাস পাওয়া যায়নি এবং মাত্র পঁয়ষট্টি দিনকে ‘সহনযোগ্য’ হিসেবে ধার্য করা হয়। দূষণের সমস্যা এখন ভৌগোলিকভাবে আরও বিস্তার লাভ করছে। উত্তর ভারতের বাইরে থাকা অনেকেই সান্ত্বনা নিয়ে বলেন, কমপক্ষে আমাদের বাতাস দিল্লির মতো খারাপ নয়। কিন্তু এটা ঠিক সেই ধরনের সান্ত্বনা, যেমন আফগানিস্তানকে নারীর অধিকারের মানদণ্ড ধরে নেওয়া। এদিকে, পূর্বাঞ্চলের কলকাতায় বিখ্যাত হাওড়া সেতুও এখন বায়ু দূষণের জন্য প্রায়ই আবছা দেখা যায়। পশ্চিম উপকূলের মুম্বাইয়ে কুয়াশার আড়ালে মিলিয়ে যায় আকাশরেখা। এমনকি দক্ষিণেও, যেখানে বাতাস তুলনামূলকভাবে পরিষ্কার, সেখানেও সূর্যের আলো ঢেকে যায় ধূলিকণায়, আর এই কণা জমে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ধমনীও। ভারতের ক্রমবর্ধমান বায়ুদূষণের নেপথ্যে কারণ বহু। বড় কারণগুলোর একটি হচ্ছে- মোটরগাড়ির মালিকানা দ্রুত বৃদ্ধি। নড়বড়ে যানব্যবস্থা গাড়িকে থেমে-থেমে চলা জটের মধ্যে ফেলে, ফলে নির্গমন আরও বাড়ে। অবিরাম সড়ক নির্মাণ ও দেশজুড়ে দালান-বাড়ি তৈরির ঢেউ জমাট ধুলো ছড়ায়। নগর-উপকণ্ঠজুড়ে থাকা ইটভাটা ধোঁয়া বাড়ায় আরও। এই দূষণের খরচও বাড়ছে। চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী দ্য ল্যানসেটের হিসাবে, প্রতিবছর প্রায় সতেরো লাখ মানুষ ভারতের দূষণজনিত কারণে মারা যায়। গত মাসে দাভোস সভায় হার্ভার্ডের গীতা গোপীনাথ মন্তব্য করেন যে দূষণের অর্থনৈতিক প্রভাব ‘মার্কিন শুল্কের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ’। গীতা গোপীনাথ ঠিকই বলেছেন। ২০১৯ এ ডালবার্গ নামের একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে দূষণের কারণে ভারতের বার্ষিক অর্থনৈতিক ক্ষতি মোট দেশজ উৎপাদনের তিন শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়। বিপরীতে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত পঞ্চাশ শতাংশ শুল্ক, যা পরে শিথিল করা হয়েছে, ভারতের প্রবৃদ্ধি এক বছরে শূন্য দশমিক ছয় শতাংশ কমাতে পারতো বলে জানিয়েছিল গোল্ডম্যান স্যাক্স। অথচ ভারত সরকার সমস্যাটিকে ছোট করে দেখছে বলেই ধরা যায়। সম্প্রতি ভারতের উপ-স্বাস্থ্যমন্ত্রী সংসদে দাবি করেন, দূষণ আর মৃত্যু বা রোগের মধ্যে ‘সুনির্দিষ্ট সম্পর্ক’ নেই। তার দাবি, বায়ু দূষণের স্বাস্থ্যগত প্রভাব নানা উপাদানের সম্মিলিত প্রকাশ। গত এক ফেব্রুয়ারির বাজেটে দূষণ নিয়ন্ত্রণের বরাদ্দও কমিয়েছে ভারত সরকার। ভারতের বর্তমান পরিস্থিতিকে ধূমপানের সাথে তুলনা করা যায়। ধূমপায়ীরা জানেন দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে, এটাও জানেন যে ধূমপান ব্যয়বহুল অভ্যাস। কিন্তু এসব ঝুঁকি অনেকটাই বিমূর্ত। অদৃশ্য অর্থনৈতিক ক্ষতিও তাই সহজে উপেক্ষিত হয়। দূষণ কমানো খুব কঠিন কাজ, এর সুফল মিলবে অনেক পরে, আর এর পেছনে রাজনৈতিক সুবিধাও অস্পষ্ট। তবু বিমূর্ত অর্থনৈতিক উদ্বেগ এখন বাস্তব ব্যবসায়িক সংকটে রূপ নিচ্ছে। সাম্প্রতিক এক বিবৃতিতে ভারতের সুপারশপ চেইন ‘শপার্স স্টপ’ জানিয়েছে, ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে দূষণের কারণে ক্রেতার যাতায়াত কমে যাওয়া ও অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটায় অনীহা তৈরি হয়েছে। বিশাল মেগা মার্টের প্রধান নির্বাহীও একই প্রান্তিকে ‘উত্তর ভারতের বায়ুমান সংকট’ কেনাকাটার বৃদ্ধি কমিয়ে দিয়েছে বলে জানান। বহু দেশ দূষণের ঝুঁকি উল্লেখ করে ভারতগামী নাগরিকদের ভ্রমণ পরামর্শ জারি করছে, এতে পর্যটক আগমনও কমছে। প্রতি শীতেই দূষণের কারণে দৃশ্যমানতা কমে উত্তর ভারতে শত শত ফ্লাইট বাতিল হয়। ব্যবসায়ীদের জন্য কর্মী আনা-নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ছে। গত ডিসেম্বর এক ভারতীয় ঔষধ কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তা দিল্লির দূষণের ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে পদত্যাগ করেন। বিদেশি কর্মকর্তারাও একই কারণে ভারতে কাজ নিতে অনীহা প্রকাশ করা শুরু করেছেন। গত বছর এক বিদেশি বিনিয়োগকারী দুর্বল বায়ুমানের কারণে একটি কথোপকথনমূলক অনুষ্ঠানের মাঝপথে বেরিয়ে আসেন। সব মিলিয়ে বিষয়টি এখন লজ্জাজনক পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। ডিসেম্বর মাসে ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকার একটি ক্রিকেট ম্যাচ বাতিল করতে হয়, কারণ ধোঁয়ায় বল দেখা যাচ্ছিল না। জানুয়ারিতে বিশ্বের শীর্ষ ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড়দের একজন দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ভারত ওপেন প্রতিযোগিতা থেকে সরে দাঁড়ান। এর জন্য তাকে জরিমানা গুনতে হয় ও বাকি যারা খেলেছিলেন, তারা আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পাঠান। একজন ধূমপায়ীকে শেষ পর্যন্ত কী থামায়? বহু ক্ষেত্রে তীব্র কোনো স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা। দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা হঠাৎ তীব্র আকার নিলে মানুষ বদলায়। ভারতের অর্থনীতির ক্ষেত্রেও এখন তেমনটাই ঘটছে। দূষণ সরাসরি ভোগব্যয়, প্রবৃদ্ধি ও নরেন্দ্র মোদীর বহুবার ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতকে সমৃদ্ধ দেশ বানানোর স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই ভারত সরকার যদি এই বিষয়ে এখনই সতর্ক না হয় ও কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে মোদীর আকাঙ্ক্ষা আর কখনোই পূরণ হবে না। সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট এসএএইচ