দিনের তারা
2026-03-03 - 04:33
পথিক কাজী প্রতিদিনই ধাক্কা খেতে খেতে মেট্রোরেলে উঠি। বিশেষ করে রমজানের এই দিনগুলোতে সবার একই সময়ে বাড়ি ফেরার তাড়া। ধাক্কাগুলো তাই নীরবে হজম করি। ভেতরে ঢুকেও কী শান্তি আছে? চারপাশ থেকে যেন চেপে ধরে কয়েক মেগাপ্যাস্কেল চাপ, পাঁজরের হাড়ের বক্রতা কোনো দিন যে সরল রেখা হয়ে যাবে, কে জানে? অফিসের চাপ মাথায় নিয়ে এই বৈদ্যুতিক শকটে উঠে যেন একই সাথে কয়েক হাজার ভোল্টের শক খেলাম! কী এক তরংগ খেলে গেল হৃদয় থেকে মস্তিষ্কে! সে কি বিদ্যুৎ তরংগ? নাকি অন্য কিছু? সেই ১৯৯৬ সালে তোমাকে শেষ দেখেছিলাম। স্কুলে এসেছিলে, এসএসসির রেজাল্ট জানতে। ‘আমি দূর হতে তোমারে দেখেছি, আর মুগ্ধ এ চোখে চেয়ে থেকেছি’ - হেমন্ত মুখার্জির গান তখন গ্রামোফোনের ভাঙা ডিস্কের মতো একটানা বুকের ভেতর বাজছিল। আজকালকার ছেলেমেয়েরা এটাকে বলে ‘লুপ মোড’, এক গান বার বার...। তুমি নোটিশ বোর্ডে নামের তালিকায় তোমার নাম খুঁজে পেয়ে কেঁদে ফেলেছিলে। না, ফেল নয়, তুমি স্টার পাওনি, তাই এই কান্না। সে কান্না ভেজা চোখ, সেই ওড়না ঢাকা অর্ধেকটা মুখ, যেন মেঘে ঢাকা আধখানা চাঁদ! আজও সেই চাঁদের মতোই লাগছে তোমাকে। বসে আছ মেট্রোর সবুজ প্লাস্টিকের বেঞ্চিতে, তাকিয়ে আছ বাইরের পশ্চাতধাবমান মিরপুরের ভবনগুলোর দিকে। ৩০ বছর পর দেখা। তোমার চেহারায় তেমন কোনো পরিবর্তন নেই, কেবল চোখের কোনের ত্বকে সামান্য কুঞ্চন। এদিকে আমার চুলের অর্ধেকটা ধূসর, মুখে সাদা-কালো দাড়ি-গোঁফ। কৈশোরের রঙিন দিনগুলো ফেলে এসেছি কোন সুদূরে, যেন সে আমার পূর্বের জনম। তোমার সামনেই বাদুড়ঝোলা হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। তুমি দেখছও না। কথা বলব? আমার ডাকনামটা কি মনে রেখেছ? ভাবতে ভাবতে উত্তরা এসে গেলো। রেলের কামরাটা ফাঁকা হচ্ছে, তুমি উসখুস করছ। নামার প্রস্তুতি। তোমার পাশের সিটটা ফাঁকা হলো। আমি চাইলেই তোমার গা ঘেঁষে বসতে পারি, যেমন বসেছিলাম, ক্লাস এইটের বৃত্তি পরীক্ষার কোচিং ক্লাসে...। মনে আছে, একটা বেঞ্চ নিয়ে কী কাড়াকাড়ি করেছিলে আমার সাথে? তুমি চেয়েছিলে একা ওটায় বসতে, আমি দিইনি.... আমি আজ তোমার সবুজ বেঞ্চিতে জায়গা পেয়েও দাঁড়িয়েই রইলাম। তোমার পাশে বসলে তোমার ঐ অর্ধেন্দু মুখখানা যে এভাবে আর দেখতে পাবো না! তোমার স্টেশনেই রেলের শেষ গন্তব্য। তুমি নেমে যাচ্ছ। আমাকেও নামতে হবে। কী আশ্চর্য, ‘আমরা দুজন একটি গাঁয়ে থাকি, সেই আমাদের একটিমাত্র সুখ’! আর হয়তো দেখা হবে না। প্রতিদিন তুমি হয়তো এই রেলে যাতায়াত করো, নারীদের কামরায়। আজ ওখানে বড্ড ভিড়। বইমেলা শুরু হয়ে গেছে, তাই বাসন্তী রমনীরা ওদিকে আজ মেলা বসিয়েছে। ভাগ্যিস ওদিকটায় আজ যাওনি...। সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছ তুমি। আমিও নামছি। একটু তফাতে। তোমার ছিপছিপে শরীরে আজ বয়সের ভারিক্কি, তবু যেন সেই তন্বী কিশোরী... শাড়িতে তোমাকে এই প্রথম দেখলাম, এটাই কি শেষ? ডেকে কথা বলব? কী বলব? ‘কী কথা তার সাথে? তাহার সাথে?’ তার চেয়ে বরং ভেবে নিই, ‘রাতের সব তারাই থাকে, দিনের আলোর গভীরে’। (কবিতার লাইনগুলো জীবনানন্দ ও রবীন্দ্রনাথের) এমআরএম/জেআইএম