কাতারের রাস লাফান-ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্র কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
2026-03-20 - 08:30
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের নতুন মাত্রা যোগ করে বুধবার (১৮ মার্চ) ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলা। এর কিছুক্ষণ পরই ইরান পাল্টা হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে, যার মধ্যে কাতারের রাস লাফান গ্যাস স্থাপনাও রয়েছে। এটি ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধের সর্বশেষ উত্তেজনা, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে বোমা হামলা চালিয়ে তেহরানে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের হত্যা করে। এরপর ইরান ইসরায়েলকে লক্ষ্যবস্তু করলেও, উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপরও হামলা চালিয়েছে। সাউথ পার্স ও রাস লাফানে যা ঘটেছে বুধবার (১৮ মার্চ) ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্র সংশ্লিষ্ট প্রাকৃতিক গ্যাস স্থাপনাগুলোতে হামলা হয়েছে। এরপর ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল ও গ্যাস অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দেয়। এতে অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো আরও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, যা ইতোমধ্যেই ২০ দিন ধরে চলা যুদ্ধে বিপর্যস্ত। এর কয়েক ঘণ্টা পর কাতারের উত্তরাঞ্চলের রাস লাফান শিল্পনগরীর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস স্থাপনায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। দোহা জানায়, এই হামলায় তিনটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। কাতারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, আগুন প্রাথমিকভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে এবং কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, রাস লাফান শিল্পনগরী লক্ষ্য করে ইরানের এই ‘স্পষ্ট হামলার’ তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে দোহা। এই হামলায় স্থাপনাটির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জি জানায়, আরও কয়েকটি এলএনজি স্থাপনাও হামলার শিকার হয়েছে, যার ফলে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ও অতিরিক্ত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া এই হামলার প্রতিক্রিয়ায় কাতার কয়েকজন ইরানি সামরিক ও কূটনৈতিক কর্মকর্তাকে বহিষ্কার করে, তাদের ‘অবাঞ্ছিত ব্যক্তি’ ঘোষণা করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, সাউথ পার্সে ইসরায়েলের হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র বা কাতার কেউই আগে জানতো না ও এতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। তিনি দাবি করেন, ইরান এসব তথ্য না জেনেই অন্যায়ভাবে কাতারের গ্যাস স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। ট্রাম্প আরও বলেন, ইরান যদি আবার কাতারের মতো ‘নিরীহ’ কোনো দেশকে আক্রমণ করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সহযোগিতা থাকুক বা না থাকুক, অভূতপূর্ব শক্তি দিয়ে পুরো সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্র ধ্বংস করে দেবে। অন্যান্য দেশের প্রতিক্রিয়া রিয়াদে আরব ও মুসলিম দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের পর সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইরানের হামলার সহনশীলতা সীমিত। তিনি সতর্ক করে বলেন, সৌদি আরব ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের ‘গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা’ রয়েছে, প্রয়োজনে তারা তা ব্যবহার করবে। তিনি আরও বলেন, আমাদের ধৈর্যের সীমা আছে। তা একদিন, দুইদিন বা এক সপ্তাহ হতে পারে, কিন্তু তা অসীম নয়। সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্র কতটা গুরুত্বপূর্ণ? সাউথ পার্স বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্রের অংশ, যার আয়তন প্রায় ৯ হাজার ৭০০ বর্গকিলোমিটার। এটি ইরান ও কাতারের মধ্যে ভাগাভাগি অবস্থায় আছে। এটি ইরানের উপকূলীয় শহর আসালুয়েহর কাছে অবস্থিত। এই ক্ষেত্রের এক-তৃতীয়াংশ ইরানের অংশ, যাকে সাউথ পার্স বলা হয়, আর কাতারের অংশটির নাম নর্থ ফিল্ড। বলা হচ্ছে, এই গ্যাসক্ষেত্রে হামলা আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে বড় প্রভাব ফেলবে না, কারণ ইরান এখানকার অধিকাংশ গ্যাস নিজ দেশে ব্যবহার করে। ইরান বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম এলএনজি ভোক্তা, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের পরেই। দেশটি গরম করা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। সাউথ পার্স ইরানের গ্যাস সরবরাহের প্রধান উৎস, যা দেশের মোট প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ পূরণ করে। এছাড়া ইরান কিছু গ্যাস ইরাকে রপ্তানি করে এবং দেশটির গ্যাস ও বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পূরণ করে। বুধবার (১৮ মার্চ) ইরাকি বার্তা সংস্থা জানায়, সাম্প্রতিক আঞ্চলিক পরিস্থিতির কারণে ইরানি গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে, ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। রাস লাফান এলএনজি স্থাপনার গুরুত্ব কতখানি? দোহা থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত রাস লাফান বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি উৎপাদন কেন্দ্র। এটি বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ এলএনজি সরবরাহ করে এবং এশিয়া ও ইউরোপের জ্বালানি চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মার্চের শুরুতে যুদ্ধ শুরুর কয়েকদিনের মধ্যেই রাস লাফানের কাছে হামলা হওয়ায় কাতার এলএনজি উৎপাদন স্থগিত করে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আগেই উৎপাদন বন্ধ থাকায় তাৎক্ষণিক বৈশ্বিক সরবরাহে নতুন ধাক্কা না এলেও আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সরবরাহে চাপ বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে দাম বাড়তে পারে। আরও বলা হয়েছে, স্থাপনাটির ব্যাপক ক্ষতির কারণে যুদ্ধ শেষ হলেও উৎপাদন স্বাভাবিক হতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। জ্বালানি বাজারে প্রভাব কী? এই হামলাগুলোর পর ইউরোপে এলএনজি পাইকারি দাম তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। নেদারল্যান্ডসের প্রধান গ্যাস বাজারে প্রতি মেগাওয়াট ঘণ্টার দাম বেড়ে ৬৮ দশমিক ০৩ ইউরোতে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া অপরিশোধিত তেলের দামও বেড়ে বৈশ্বিক মানদণ্ড ব্রেন্ট প্রতি ব্যারেল ১১৫ ডলারে পৌঁছেছে, যা যুদ্ধ শুরুর আগে ছিল ৬৫ ডলারের কাছাকাছি। ২ মার্চ ইরানের এক সামরিক উপদেষ্টা হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করার পর থেকেই তেলের দাম বাড়তে শুরু করে, কারণ এই পথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়। সূত্র: আল-জাজিরা এসএএইচ