এবারো ঈদের আমেজ নেই অর্ধলাখ লবণচাষির পরিবারে
2026-03-18 - 08:51
কক্সবাজার-চট্টগ্রাম উপকূলজুড়ে দেশের লবণ শিল্পে নিয়োজিত লক্ষাধিক মানুষের ঘামেই পূরণ হচ্ছে দেশের চাহিদা। প্রায় ৪০ হাজার লবণচাষি ও অর্ধলাখ শ্রমিকের নিরলস পরিশ্রমে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ লবণ উৎপাদিত হলেও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় চাষিরা পড়ছেন চরম আর্থিক সংকটে। উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের, তবুও শ্রমিকদের বেতন পরিশোধে বাধ্য হচ্ছেন তারা। এদিকে সামনে ঈদুল ফিতর। চারদিকে উৎসবের আমেজ, বাজারে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। কিন্তু ক্ষতির মুখে থাকা লবণচাষিদের ঘরে নেই সেই আনন্দ, বরং দুশ্চিন্তা আর টানাপড়েন যেন নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে। দরজায় কড়া নাড়ছে ঈদুল ফিতর। ঈদে নতুন জামা পরতে কক্সবাজারের বিপণিবিতান গুলোতে ভিড় জমাচ্ছে সব পেশার মানুষ। দুপুর গড়াতেই ক্রেতাদের ভিড় বাড়ছে, যা গভীর রাত পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। জেলা ও উপজেলা সদরের মার্কেটগুলো সেহেরি টাইম পর্যন্ত খোলা থাকছে। পানবাজার সড়কের ফিরোজা মার্কেট, সালাম মার্কেট, নিউমার্কেট, সুপার মার্কেট, ফজল মার্কেট, হকার্স মার্কেট, ঝাউতলায় টপটেন, আড়ং, জেন্টেলপার্কসহ চোখ ধাঁধানো শোরুমগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় রয়েছে। বিশেষ করে নারী-শিশুদের পোশাকের দোকানগুলোতে সমাগম বেশি ক্রেতাদের। তবে এই উৎসবময় পরিবেশেও স্বল্প আয় বা লবণে ক্ষতির মুখে থাকা মানুষের মুখে হতাশা স্পষ্ট। পছন্দের পোশাক দেখলেও দাম বেশি হওয়ায় শেষমেষ না কিনেই ফিরে যাচ্ছেন। ঈদগাঁওয়ের গোমাতলী এলাকার লবণচাষি রিদুয়ানুল হক বলেন, গত মৌসুমে ৪০ হেক্টর জমিতে লবণ চাষ করেছিলাম। উৎপাদন খরচ ও বিক্রিতে সামঞ্জস্য না থাকায় মৌসুম শেষে ৩৩ লাখ টাকার মতো লস ছিল। লবণের মূল্য যাই হোক শ্রমিকদের বেতন ও খাবার খরচ ঠিকভাবে পরিশোধ করতে হয়েছে। আমার মতো একই অবস্থা ছিল, সকল লবণচাষির। তিনি আরও বলেন, এটা বাপ-দাদার পেশা। তাই ছেড়ে দিয়ে চলে যাওয়া যায় না। চলতি মৌসুমেও মাঠে নেমেছি। গত বছরের মতো চলতি মৌসুমেও লবণের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না চাষিরা। মণ প্রতি প্রায় সাড়ে ৩শ টাকা খরচের লবণের বাজার মূল্য মিলছে ১৮০ থেকে ২০০ টাকা। এতে লস থাকছে প্রায় ১৭০ থেকে ১৫০ টাকা। এবার নির্বাচিত সরকার এলেও এখনো ন্যায্যমূল্য না মেলায় লবণের সঙ্গে সম্পৃক্ত অর্ধলক্ষাধিক পরিবারে গতবারের মতো এবারও ঈদ আনন্দ থাকবে না। যেসব পরিবার সন্তানদের ঈদে অন্তত দুই সেট কাপড় কিনে দিতেন তারা এবার এক সেট কিনতেই হিমশিম খাচ্ছে। এদিকে চলতি মৌসুমের চার মাস পেরিয়ে গেছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় পুরোদমে চলছে লবণ উৎপাদন। কিন্তু চাষিদের চোখে-মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ। নতুন সরকার ক্ষমতা নিয়েছে একমাস হতে চললো। এখনো লবণের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে কোনো সুখবর আসেনি। মাত্র দুই-আড়াই মাস পর মৌসুম শেষ হবে- এরমাঝে মণপ্রতি ৪০০-৫০০ টাকা না পেলে লোকসানে পড়বেন উপকূলের হাজার হাজার লবণচাষি। কক্সবাজার সদরের চৌফলদণ্ডীর লবণচাষি হারুন রশীদ বলেন, গেলো মৌসুমে দুই একর জমিতে লবণ চাষ করে লোকসান গুনেছি প্রায় তিন লাখ টাকা। এবার পরিমাণ কমিয়ে দেড় একরে চাষ করেছি। শ্রমিকের বেতন এক লাখ ২০ হাজার টাকা। তার খাবার, জমির লাগিয়ত ও আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে সাড়ে তিন থেকে চারলাখ টাকা খরচ হবে। এখন যে দামে লবণ বিক্রি হচ্ছে, ন্যায্যমূল্য না পেয়ে চরম হতাশায় দিন কাটছে। দেনায় শ্রমিকের বেতন পরিশোধ করেছি, নিজের পরিবারের সদস্যদের জন্য ঈদের কেনাকাটা করা সম্ভব হয়নি এখনো। এভাবে প্রতি মৌসুমে লোকসান গুনতে হলে লবণচাষ টিকিয়ে রাখা খুবই কঠিন হয়ে পড়বে। মহেশখালীর চাষি কামরুল হাসান (৫৫) বলেন, মনে করেছিলাম এবার উৎপাদন খরচ উঠে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে দাঁড়াতে পারবো। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে এসে দাঁড়িয়েছি, রোজায় ভালো খাবার খাওয়া এবং সন্তানদের জন্য ঈদের বাজার করার সামর্থ্যও এখনো হয়নি। আমার মতো একই অবস্থা প্রায় সকল চাষিদের। ভারুয়াখালীর লবণচাষি রাজিবুল হক রাজু বলেন, নির্বাচনের আগে জনপ্রতিনিধিরা লবণ চাষিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের আশ্বাস দিয়েছিলেন। বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে, এখন সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অপেক্ষায় উপকূলের হাজারো লবণ চাষি। আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি, চাষিরা যেন উৎপাদিত লবণের ন্যায্যমূল্য পায়। আমাদের একটাই দাবি- লবণের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা হোক। কক্সবাজার চেম্বারের সভাপতি ও লবণচাষি কল্যাণ সমিতির উপদেষ্টা আবদুল শুক্কুর বলেন, কক্সবাজারে মানসম্মত লবণ উৎপাদন হয়ে আসছে দশকের পর দশক। তবুও ইন্ডাস্ট্রিয়াল লবণের কথা বলে আমদানির কারণে স্থানীয় চাষিরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। এছাড়া ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির অপব্যবহারও বাজারকে প্রভাবিত করছে। তাই আমরা সরকারের কাছে অনুরোধ জানাই- অতি দ্রুত লবণ আমদানি বন্ধ করে চাষিদের রক্ষায় উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হোক। বিসিকের কক্সবাজারের লবণ শিল্প উন্নয়ন কার্যালয়ের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. জাফর ইকবাল ভুঁইয়া বলেন, চলতি মৌসুমে লবণ চাষিদের মাঠে নামতে কিছুটা দেরি হয়েছে। তারপরও এখন আবহাওয়া অনুকূলে। পুরোদমে লবণ চাষও হচ্ছে। আশা করি মাঠে লবণ উৎপাদনের পরিমাণ বাড়বে। পাশাপাশি লবণের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে সরকার কাজ করছে। লবণের দাম বাড়লে আগামী মৌসুমে চাষি ও মাঠের পরিমাণ বাড়বে। বিসিক জানায়, গত মৌসুমে ৬৮ হাজার ৫০৫ একর জমিতে উৎপাদিত হয়েছিল ২৫ লাখ ২৮ হাজার মেট্রিক টন লবণ। আর চলতি মৌসুমে ২৬ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে মাঠে নামা চাষিরা মৌসুমের চার মাসে উৎপাদন করেছে প্রায় ৫ লাখ মেট্রিক টন। এফএ/এমএস